পারভেজ আহমদ :::সিলেটে আবারও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে বিদ্যুৎ বিভ্রাট। গত কয়েকদিন ধরে দিন-রাত সমানতালে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ঘনঘন লোডশেডিং হচ্ছে। কোনো কোনো এলাকায় এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকার পরই পরের ঘণ্টায় চলে যাচ্ছে, আবার কোথাও টানা দুই ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না বলে অভিযোগ করেছেন নগরবাসী। গরমের মধ্যে এমন ঘনঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক জনজীবন।
বিশেষ করে রাতের বেলায় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি বাড়ছে। প্রচণ্ড গরমে ঘুমাতে না পেরে শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে বিপাকে পড়ছেন পরিবারগুলো। বাসাবাড়ির পাশাপাশি দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, অফিস ও বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রমেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বিদ্যুৎনির্ভর যন্ত্রপাতি বন্ধ থাকায় ব্যাহত হচ্ছে ব্যবসায়িক কার্যক্রম। অনলাইনে কাজ করা ব্যক্তি, ফ্রিল্যান্সার ও শিক্ষার্থীরাও পড়ছেন বাড়তি ভোগান্তিতে।
নগরীর আম্বরখানা এলাকার একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কর্মী হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘অফিস সময়ের আট ঘণ্টার মধ্যে কয়েকবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলে পরের ঘণ্টায় আবার থাকে না। এভাবে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ব্যবসায়ও ক্ষতি হচ্ছে।
বাগবাড়ি এলাকার বাসিন্দা জাহিদ আহমেদ বলেন, ‘গত রাতে প্রায় ১২টার দিকে ছোট সন্তানকে নিয়ে ঘুমাতে যাওয়ার পরই বিদ্যুৎ চলে যায়। প্রায় এক ঘণ্টা পর বিদ্যুৎ আসে। এই গরমের মধ্যে ছোট শিশুকে নিয়ে ওই সময়টা খুব কষ্টে কাটাতে হয়েছে।
একই এলাকার বাসিন্দা কয়েস আহমদের অভিযোগ, ‘এক ঘণ্টা পরপর লোডশেডিং হচ্ছে। কখনো কখনো এক ঘণ্টা পরপর দুই ঘণ্টা করেও বিদ্যুৎ থাকে না। দিন-রাত সমানতালে লোডশেডিংয়ের কারণে অসহনীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিদের সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে।
খাসদবীর এলাকার বাসিন্দা আব্দুল লতিফ বলেন, ‘কোনো ধরনের পূর্বঘোষণা ছাড়াই গভীর রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। কখন বিদ্যুৎ যাবে বা কখন আসবে এ বিষয়ে অনেক সময় কিছুই জানা যায় না। বিদ্যুৎ বিভাগের এমন পরিস্থিতিতে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।’
পুরোনো সংকট কাটেনি, নতুন করে বাড়ছে ভোগান্তি
সিলেটে বিদ্যুৎ সংকট অবশ্য নতুন কোনো ঘটনা নয়। গত এক বছর ধরে বিভিন্ন সময়ে চাহিদার তুলনায় কম সরবরাহ পাওয়ায় নগরীসহ বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং করতে হয়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকেই জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদার তুলনায় কম বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়ার কারণে দিনে ও রাতে একাধিকবার লোডশেডিং করা হয়। অক্টোবরেও ঘনঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে জনদুর্ভোগ অব্যাহত ছিল।
চলতি বছরের এপ্রিলেও সিলেটে তীব্র বিদ্যুৎ সংকট দেখা দেয়। সে সময় চাহিদার তুলনায় সরবরাহে ঘাটতি ছিল প্রায় ৩৫ শতাংশ। ফলে প্রায় এক ঘণ্টা পরপর বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং করতে হয়। তখন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) জানিয়েছিল, জ্বালানি সংকট, জাতীয় গ্রিড থেকে কম সরবরাহ এবং কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে উৎপাদন কমে যাওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
এরপর জুনেও সংকট পুরোপুরি কাটেনি। ওই সময় সন্ধ্যা পর্যন্ত সিলেট অঞ্চলে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ২৩২ মেগাওয়াট। বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ পাওয়া যায় মাত্র ১৪৮ মেগাওয়াট। অর্থাৎ তখন ঘাটতি ছিল ৮৪ মেগাওয়াট।
চাহিদা ২৩৩, সরবরাহ ১৭৭ মেগাওয়াট
সর্বশেষ আগস্টেও সেই সংকট অব্যাহত রয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদার তুলনায় কম সরবরাহ পাওয়ার কারণেই বিভিন্ন এলাকায় বারবার লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
সিলেট বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী ইমাম হোসেন জানান, রোববার সিলেট বিভাগের পিডিবির আওতাধীন এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ২৩৩ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ পাওয়া গেছে ১৭৭ মেগাওয়াট। ফলে বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় মোট ঘাটতি ছিল ৫৬ মেগাওয়াট।
তিনি বলেন, ‘আগামী কয়েকদিন এ পরিস্থিতি চলমান থাকবে কি না, তা সঠিকভাবে বলা যাচ্ছে না। তবে জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ বাড়লে লোডশেডিংয়ের মাত্রা অনেকাংশে কমে আসবে বলে আশা করা যাচ্ছে।’
কবে কাটবে সংকট, নেই স্পষ্ট উত্তর
বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, সিলেটে বর্তমানে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে। এই ঘাটতি পূরণ করতে গিয়ে বিভিন্ন এলাকায় পালাক্রমে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। কিন্তু জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ কখন বাড়বে, কিংবা বর্তমান বিদ্যুৎ বিভ্রাটের পরিস্থিতি কবে পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে এ বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা দিতে পারছেন না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ফলে একদিকে প্রচণ্ড গরম, অন্যদিকে ঘনঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট দুইয়ের চাপে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন সিলেটের মানুষ। নগরবাসীর প্রশ্ন, বছরের পর বছর ধরে চাহিদা ও সরবরাহের এই ঘাটতি কেন কাটছে না এবং বারবার একই ধরনের সংকটের মুখে পড়তে হচ্ছে কেন?
বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে দ্রুত সরবরাহ বাড়িয়ে লোডশেডিং কমানোর আশ্বাস দেওয়া হলেও, আপাতত সেই আশ্বাসে স্বস্তি ফিরছে না নগরবাসীর জীবনে। রাতের ঘুম থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য ও দৈনন্দিন কাজ সবকিছুতেই বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়ছে। আর গরম যত বাড়ছে, ঘনঘন লোডশেডিং নিয়ে মানুষের ক্ষোভ ও দুর্ভোগও ততই বাড়ছে।
Leave a Reply